আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায়ের খবরে বিরাট কোহলিকে নিয়ে সারা বিশ্ব মুহ্যমান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রিকেট প্রেমীরা ঝড় তুলে দিয়েছেন। এমন কী আন্তর্জাতিক স্তরে একের পর এক বরেণ্য ক্রিকেটার তুলে ধরছেন, বিরাটকে নিয়ে তঁাদের আবেগঘন মুহূর্ত। অথচ একদিন এই বিরাট কোহলি কলকাতায় খেলে গিয়েছেন। তাও আবার মোহনবাগানের জার্সি গায়ে দিয়ে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। এটাই বাস্তব। আরও শুনলে অবাক হবেন, এই কোহলিকে কলকাতায় নিয়ে আসার নেপথ্যে ছিলেন একজনই, মোহনবাগানের প্রাক্তন সচিব সৃঞ্জয় বোস।
২০০৯ সালের ২৪ জুন। সেই দিনটার কথা সোমবার ময়দানে বারবার ফিরে এসেছে। অনেকে এও মনে করছেন, মাত্র কয়েক দিন আগেকার ঘটনা। যাইহোক পি.সেন ট্রফি তখন কলকাতায় রমরমিয়ে হতো। সেবার ফাইনালে মোহনবাগানের মুখোমুখি হয়েছিল টাউন ক্লাব। দুর্ধ্বর্ষ দল টাউন। মোহনবাগানও ছাড়ার পাত্র নয়। সৃঞ্জয়ের বয়সও তখন কম। আবেগের জোয়ারে তখন তিনি ভেসে চলেছেন। চায়ের তুফানে ঝড় উঠল। টাউনের কাছে পিসেন ট্রফি হাতছাড়া করবে মোহনবাগান! তখন পিসেন ট্রফিতে বর্হিরাজ্যের ক্রিকেটারকে খেপ খেলানোর ঢঙে নিয়ে আসা যেত। সুতরাং মোহনবাগানকে জেতার জন্য এমন একজনকে চাই যিনি অনায়াসে জেতানোর ক্ষমতা রাখেন। বিরাট তখন নাম করছেন। কিন্তু তারকা বনে যাননি। সন্ধান পেয়েই ঝঁাপ দিলেন বাগানের প্রাক্তন সচিব। কথা হল, বিরাটকে নিয়ে এসে পিসেন ট্রফির ফাইনালে মোহনবাগান জার্সিতে খেলানো হবে। তখন ক্লাবের সচিব ছিলেন অঞ্জন মিত্র। যিনি সৃঞ্জয়কে পুত্রসম মনে করতেন। তাই ক্রিকেট বিরোধী হলেও সচিব আর অমত করেননি। সচিবের সম্মতি পেয়েই বিরাটকে নিয়ে আসা হল কলকাতায়। তারপরের ঘটনা সবই ইতিহাস হয়ে রয়ে গিয়েছে।
প্রকৃতির ঝড় নয়, সেদিন ইডেন দেখেছিল এক তরুণ-তুর্কির ব্যাটিং তান্ডব। যেন সংহার মুর্তি ধরে টাউন বোলারদের গলা টিপে মারছেন। এক একটা বল তঁার ব্যাটের সামনে আসছে, আর ওই বলের ঠিকানা হচ্ছে ইডেনের গ্যালারি। এখন ইডেনে বিরাট খেলতে এলে পুরো গ্যালারি তঁার হয়ে যায়। অথচ সেদিনের গ্যালারি কিন্তু জনমানব শূন্য ছিল। গুটিকয়েক মোহনবাগান সমর্থক ভিড় জমিয়ে ছিলেন প্রিয় দলের খেলা দেখতে। মনে রাখবেন, কোহলি দর্শনে নয়। কী করেছিলেন কোহলি? বরং পাল্টা প্রশ্ন করা উচিত, কী করেননি সেদিন কোহলি? ১২১ বলে করেছিলেন ১৮৪ রান। প্রতিপক্ষ টাউনের সেদিন এমন অবস্থা হয়েছিল যেন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বঁাচি। ৯৭ রানে অনায়াসে জিতেছিল মোহনবাগান। জেতার নেপথ্যে থেকে গিয়েছিলেন একজনই-বিরাট কোহলি। কী অনায়াস ব্যাটিং, প্রতিটি ব্যকরণচিত শট। অচেনা, অজানা মোহনবাগানিদের নিয়ে ফিল্ডিংয়ের সময়ে ঝঁাপিয়ে পড়া। মুহূর্তের মধ্যে হয়ে গিয়েছিলেন, একজন টিমম্যান। আসলে এটাই হল তঁার স্বভাব। যেখানে খেলুন দেশ কিংবা পাড়া, জেতাই ছিল তঁার একমাত্র মূলমন্ত্র। আজ পি.সেনের সেই রমরমা হয়তো তেমন নেই। অথচ একদিন এই পি সেন ট্রফি শচীন তেন্ডুলকর, কপিলদেব, মনোজ প্রভাকর, প্রভীন আমরে, মহেন্দ্র সিং ধোনিরা খেলে গিয়েছেন। তবু সকলকে যেন ছাপিয়ে গিয়েছিলেন বিরাট কোহলি। কেন বিরাট? ওই যে দলের প্রতি একাত্মতা। কখনও তিনি ভাবেননি খেপ খেলতে এসেছেন। দিনের শেষে ফ্লাইট ধরতে ছুট লাগিয়ে ছিলেন দমদম এয়ারপোর্টের দিকে। যেতে যেতে তঁার সঙ্গীকে বলে গিয়েছিলেন, ফের যদি সুযোগ আসে তাহলে যেন তঁাকে বলা হয়। তাহলে তিনি আবার আসবেন খেলতে।
বর্তমান ক্লাব নির্বাচনে ব্যস্ত সৃঞ্জয় বোস। শোনা যাচ্ছে তিনি সচিব পদে প্রার্থী হতে চলেছেন। তবু সেদিনের স্মৃতি হাতড়ে ব্যস্ততার মধ্যে সৃঞ্জয় বলছিলেন, “সেদিনের কথা এখনও মনে পড়ে। পি সেন ট্রফির ফাইনালে উঠেছে মোহনবাগান। টাউন যথেষ্ঠ ভাল দল। সেবার ঘরোয়া ক্রিকেটে টাউন দারুন খেলছিল। তাই মোহনবাগানের অনেকে বললো, টাউনের কাছে হেরে গেলে ক্লাবের সম্মান বলে কিছু থাকবে না। জেদ চেপে গেল আমার। টাউনকে হারাতেই হবে। হারাব বললেই তো আর হারানো যায়না। ভালমানের ক্রিকেটার চাই। যে মোহনবাগানকে জেতানোর ক্ষমতা রাখবে। তখন কোহলি তারকা হয়নি। যোগাযোগ করে নিয়ে আসা হল বিরাট কোহলিকে। সেদিন শুধু কোহলি আসেনি, লক্ষ্মীপতি বালাজি ও মনীশ পান্ডে এসেছিল।” মোহনবাগানের খেলা থাকলে সৃঞ্জয় সাধারণত মাঠে যাননা। টেনশন সহ্য করতে পারেননা তাই। সেদিনও মাঠে যাননি। কিন্তু ইডেনের চারিদিকে গাড়ি নিয়ে ঘুরে গিয়েছেন। নিয়েছেন ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তের খবর। দল যখন জেতার জায়গায় নিশ্চিত পৌছে গিয়েছে তখন ঢুকে ছিলেন ইডেনে। আর একজনের স্মৃতিও যেন মনের অকপটে বারবার ভেসে ওঠে। তিনি হলেন বর্তমান ইস্টবেঙ্গল ক্রিকেট দলের কোচ আব্দুল মুনায়েম। কিছুদিন আগেও তিনি ছিলেন ভবানীপুর ক্লাবের কোচ। যেবার কোহলি এলেন পিসেন খেলতে সেবার মোহনবাগানের কোচ ছিলেন মুনায়েম। ১৬ বছরের আগেকার ঘটনা। তবু জিজ্ঞেস করতে গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেলেন। “প্রথম ম্যাচে সেভাবে সুবিধে করতে পারেনি। হতেই পারে। একটা দলের হয়ে খেলতে এসে রাতারাতি দারুন কিছু করে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ফাইনালে যা দেখাল তা কোনওদিন ভুলব না। বাচ্চা ছেলে, অথচ ওর ব্যাটিং সেদিন দেখে কেমন যেন চমকে উঠছিলাম। ভাবছিলাম, শচীন তেন্ডুলকর, এই ছেলেটার কিছুই নয়। কী অনায়াসে সব শট মারছিল।” প্রচন্ড গরমের মধ্যে ফাইনাল খেলা হয়েছিল। তাই স্মৃতির সরণী বেয়ে মুনায়েম বলতে লাগলেন, “এমন ভ্যাপসা গরম যে ব্যাট ঠিকমতো গ্রিপ করতে পারছিল না। এত ঘাম ঝরছিল। মাসল মাঝে মাঝে ক্র্যাম্প হয়ে যাচ্ছিল। চোখে-মুখে ফুটে উঠছিল যন্ত্রণার ছাপ। কিন্তু জেতানোর মন্ত্রে যেন দীক্ষিত ছিল বিরাট। তখন তার ব্যক্তিগত স্কোর ৮৯। বেচারা মাঠ থেকে ইশারা করে বললো, আর পারছে না। উঠে আসতে চায়। আমি শুধু ইশারায় বোঝালাম, সেঞ্চুরি থেকে দুটো শট দূরে। এই সময় ক্রিজ ছেড় না। বিশ্বাস করুন, পরপর দুটো ছক্কা হঁাকিয়ে সেঞ্চুরি করে ফেললো।” তারপর ইডেনে বহুবার খেলে গিয়েছেন। মনের অজান্তে নিশ্চয় মোহনবাগান মাঠের দিকে তাকিয়েছেন। হয়তো ভেসে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি নাকি বহুবার মোহনবাগানে খেলার কথা বলেছেন। আসলে সারা দেশের কাছে মোহনবাগান ক্লাব নয়, একটা প্রতিষ্ঠান। তাই নাকি কলকাতা থেকে কভার করতে যাওয়া ক্রিকেট রিপোর্টারদের গল্পের ছলে মোহনবাগানে খেলার কথা বলতেন। বিরাটের অবসর নেওয়া প্রসঙ্গে সৃঞ্জয় বলছিলেন, “সঠিক সময়ে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াও একটা শিল্প। ফর্ম থাকতে থাকতে সরে গেল বিরাট। এই মুহূর্তে সুনীল গাভাসকরকে মনে পড়ছে। তিনিও কিন্তু বিরাটের মতো ফর্মে থাকতে সরে গিয়েছিলেন। তাই ঠিকই করেছে বিরাট।”

পদপিষ্ট হওয়া ১১ সমর্থকের জন্য আজীবন আসন সংরক্ষন RCB-র
Shareগতবছরের সেই ভয়াবহ ঘটনার পর এই প্রথমবার আইপিএলের(IPL) ম্যাচ আয়োজন করতে চলেছে এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম। কিন্তু এই মাঠে ম্যাচে নামার






