সুদীপ পাকড়াশীঃ
বয়স ১১ বছর। স্থানীয় কিছু সংবাদমাধ্যম তাকে খুঁজে বার করে কথা বলেছে। কিন্তু রাজ্যের বা দেশের মেইন-স্ট্রিম মিডিয়া এখনও তার নাগাল পায়নি। চট করে পাওয়ার কথাও নয়। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট রেলস্টেশন। সেখান থেকে অটো, বাসে চেপে প্রায় ১ ঘন্টার পথ। গ্রামের নাম পারপতিরাম। সেই গ্রামে থাকে উত্তরবঙ্গের এই নতুন সম্ভাবনা। স্থানীয় কোচেরা, এবং ভারতীয় ফুটবলে অন্যতম অভিজ্ঞ এক কোচ মলয় সেনগুপ্ত তাকে সম্ভাবনা না বলে, বলছেন এই ছেলেকে ‘প্রডিজি’ বলাই ভাল!
তার নাম কিশোরমোহন ঘোষ। গ্রামে পতিরাম হাই স্কুলের ছাত্র। আর সেই স্কুলেরই মাঠের একাংশে গ্রামের ফুটবল-পাগল ছেলেদের নিয়ে চলে একটা কোচিং ক্যাম্প। নাম পিএইচএস-৯২। বড়, ছোট, সব বয়সের ছেলেদের সঙ্গে খুদে কিশোরমোহনও সেখানে অনুশীলন করে।
বাবা উত্তম ঘোষ থাকেন শিলিগুড়িতে। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। নিয়মিত বাড়ি আসার সময় পান না। তাই সংসারের পুরো দায়িত্ব মা অর্পণা ঘোষের কাঁধে। স্থানীয় একটি প্যাথোলজি ল্যাবে কাজ করেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন ছেলেকে নিয়েই তার দৈনন্দিন জীবনের লড়াই।
কিশোরমোহন কথাবার্তায় বেশ সপ্রতিভ। প্রথমবার কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলার আগে ‘নমষ্কার স্যর’ বলে কথা বলার সৌজন্য তার জানা। যে মাঠে ফুটবল কোচিং হয় তার কাছেই তাদের বাড়িটা। তাই ছোট থেকে দাদাদের দেখে মোহনের ফুটবলের প্রতি অনুরাগ তৈরি হওয়া। কিন্তু সে গোলকিপার কিভাবে হল?

মোহন বলছে, “আমি খুব ভাল ডাইভ দিতাম। বিশেষত বর্ষার মাঠে। সেটা দেখে স্যর বলেছিল গোলকিপিং করতে। সেই থেকে আমি গোলকিপার।” তারপর থেকে শুধুই নিজেকে অনুশীলনে ডুবিয়ে দেওয়া। মোহন বলল, “প্রত্যেকদিন দু-আড়াই ঘন্টা প্র্যাকটিস করি আমাদের গোলকিপার কোচ ষষ্ঠী স্যরের কাছে।”
মোহনের মা অর্পণা ঘোষ বললেন, “আমাদের অ্যাকাডেমিতে একজন কোচ, সঞ্জয় সরকার আছেন। মোহনকে ছোটবেলায় দেখেই মনে হয়েছিল খেলার বেসিক-সেন্সগুলো ওর সহজাত। প্রথমে আমার ইচ্ছে ছিল না যে ও নিয়মিত ফুটবল খেলুক। কিন্তু সঞ্জয় স্যরই ওকে মাঠে নিয়ে যান। ওকে বুট, জার্সি কিনে দিয়েছিলেন। তারপর এবছরই কলকাতার যাদবপুর মাঠে একটা টুর্নামেন্টে সেরা গোলকিপারের পুরষ্কার নিয়ে আসে। সেখানে অতিথি হিসেবে আসা তনুময় বোস, সঞ্জয় সেনের মত ব্যাক্তিত্বদের প্রশংসাও পেয়েছিল।”
সেই কিশোরমোহন আগামী বছর ব্রাজিল যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। মলয় সেনগুপ্তের আন্ধেরি ফুটবল অ্যাকাডেমি ব্রাজিলে অনূর্ধ্ব-১২-র সেভেন-এ-সাইড টুর্নামেন্ট ‘গো কাপ’ খেলতে যাচ্ছে আগামি বছরের মার্চে। গত মাসে দক্ষিণ দিনাজপুরে বিজেপি-র প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের উদ্যোগে একটি ট্রায়াল হয়েছিল। সেখান থেকে মলয় সেনগুপ্ত বেছেছেন কিশোরমোহনকে।
মুম্বই থেকে ফোনে মলয় সেনগুপ্ত বলছিলেন, “সহজাত প্রতিভা। এই বয়সে বেসিক-সেন্স এত ভাল! এই ছেলের অনেকদূর যাওয়ার কথা। আগামি বছর ২৫ মার্চ আমরা রওনা দেব। ওখানে ১০ দিনের টুর্নামেন্ট। ইউরোপের বিখ্যাত ক্লাবগুলোও তাদের অনূর্ধ্ব-১২-র দল পাঠাবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, দলগুলোর সঙ্গে ক্লাবের স্কাউটরাও আসবেন। তাদের মধ্যে কারুর যদি মোহনের খেলা চোখে যায়, তাহলে ওর ভবিষ্যত তৈরি হয়ে যাবে। ব্রাজিল যাওয়ার দিন ১০ আগে মোহনকে আন্ধেরিতে নিয়ে যাবেন মলয় বাকি ছেলেদের সঙ্গে ট্রেনিং করার জন্য।

মোহনের প্রিয় গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। প্রিয় ছবি কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ‘সোনার বুট’ হাতে নিয়ে দাঁড়ানো আর্জেন্তিনার গোলকিপারের ছবিটা। মোহন স্বপ্ন দেখে, কোনও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফটোগ্রাফাররা ওরও একইরকমের একটা ছবি তুলছে! যেখানে ওর হাতেও থাকবে সোনার বুট!
এটা তো স্বপ্নের শেষ দৃশ্য। তার আগে আরও একটা ধাপ আছে। মোহনবাগানের সমর্থক মোহনও সবুজ-মেরুণ জার্সি পরে মাঠে নামছে আর তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন মোহনের প্রিয় ভারতীয় গোলকিপার বিশাল কাইথ!







