ফাইনালে বাংলা; কোচের চোখে রিন্টুর সঙ্গে রাজা রাজবংশীও ‘ম্যান-অফ’দ্য-ম্যাচ’!

অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, ড. বিসি রায় মেমরিয়াল ট্রফির ফাইনালে পৌঁছে গেল বাংলা। সোমবার পাঞ্জাবের জিএনডি ইউ স্পোর্টস কমপ্লেক্সে শেষ চারের লড়াইয়ে গতবারের চ্যাম্পিয়ন ৩-২ গোলে হারালো মিজোরামকে। হ্যাটট্ট্রিক করেছেন তারকেশ্বরের রিন্টু মালিক। মোহনবাগানের জার্সিতে ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট লিগে খেলছেন। কোচ ফাল্গুনী দত্ত রাতে প্যারালাল স্পোর্টসকে ফোনে বললেন, “রিন্টুর দ্বিতীয় গোলটা দুর্দান্ত। এখনও চোখে ভাসছে। হ্যাটট্রিক করেছে, স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের সেরার পুরষ্কার পায়েছে। কিন্তু আমার চোখে রিন্টুর সঙ্গে আজকের ম্যান-অফ-ম্যাচ রাইট-ব্যাক রাজা রাজবংশীও। নিখুঁত ফুটবল খেলেছে।” এবার টুর্নামেন্টে ‘গ্রুপ-অফ-ডেথে’ ছিল বাংলা। সেখান থেকে নক-আউটে পৌঁছে, মিজোরামের মত কঠিন প্রতিপক্ষের বাধাও পেরল বাংলা। বুধবারের ফাইনালে বাংলার সামনে মণিপুর। ফাল্গুনী বলছেন, “উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল নম্বর নিয়ে পাস করলে ভাল কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। ছেলেদের এটা বলেই মোটিভেট করব যে, চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে তোমরা অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলে ডাক পেতে পার। সেই লক্ষ্যে নিজেদের সেরাটা দাও। চ্যাম্পিয়ন হয়ে মাঠ ছাড়ো।”
প্রয়াত ক্রীড়াসাংবাদিক তপন দাম

চলে গেলেন তপন দাম। অসুস্থ ছিলেন বেশ কিছুদিন। সোমবার শিয়ালদায় নিজের বাড়িতেই প্রয়াত হলেন তিনি। প্রায় ৪৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্ত ছিলেন ক্রীড়াসাংবাদিকতার সঙ্গে। সত্তরের শেষ থেকে আশির দশকে বিভিন্ন খেলার ম্যাগাজিনে লেখালেখি যেমন করেছেন, তেমনই দীর্ঘদিন কাজ করেছেন যুগান্তর, সংবাদ প্রতিদিনের মত দৈনিক কাগজেও। জীবনের একটা অংশে যুক্ত ছিলেন আকাশবাণী সঙ্গেও। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেলার কর্তাদের সঙ্গে তপন দামের যোগাযোগ ছিল অসাধারণ। শুধুমাত্র খবরের আদান প্রদান করাই নয়, ময়দানের প্রত্যেকের পছন্দের মানুষ ছিলেন তিনি। ক্যালকাটা স্পোর্স্টস জার্নালিস্ট ক্লাবের সঙ্গেও তখন দামের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সচিব হিসেবে যেমন গুরুদায়িত্ব সামলেছেন, ঠিক তেমনই হয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্টও। সিএসজেসির কার্যকরী কমিটিতেও ছিলেন দীর্ঘদিন। তপন দামের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে ক্যালকাটা স্পোর্টস জার্নালিস্ট ক্লাব। একই সঙ্গে তার পরিবারকেও সকল ক্রীড়া সাংবাদিক বন্ধুদের পক্ষ থেকে রইল গভীর সমবেদনা।
ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সুনীলকে অবসর ভেঙে জাতীয় দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত ঠিক বললেন মানোলো

সুনীল ছেত্রীকে অবসর ভেঙে আবার জাতীয় দলে ফেরানোয় সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু সর্বভারতীয় এক দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এফসি গোয়ার কোচ মানোলো মার্কুয়েজ বলেছেন, “হ্যাঁ, এটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমাদের তখন গোল করার সমস্যা ছিল। সুনীল তখন আইএসএলে ভালো পারফর্ম করছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার একটি বড় সুযোগ ছিল, যদি সে গোল করত, তাহলে পুরো ছবিটাই বদলে যেত। কিন্তু আমি মনে করি এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না। সুনীলের মত একজন টপ প্রফেশনাল ফুটবলারকে দলে পেয়ে কে না খুশি হয়!” মার্কুয়েজের সময়ে ভারতীয় দল ৮ ম্যাচে মাত্র একটায় জিতেছিল। এএফসি এশিয়ান কাপেও যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে ধাক্কা খেয়েছে দল। এই ব্যর্থতার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মার্কুয়েজ বলেছেন, “জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের আরও গর্ব নিয়ে মাঠে নামা উচিত। তাদের মানসিকতা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস থাকা প্রয়োজন।” স্প্যানিশ কোচের মনে হয়েছে, তাঁর কোচিংয়ের সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল একটি নির্দিষ্ট মূল দল তৈরি না হওয়া। তিনি জানান, “আমি প্রথম সাংবাদিক বৈঠকেই বলেছিলাম যে আমি একটি নির্দিষ্ট মূল দল নিয়ে কাজ করতে চাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “যদি আপনি পাঁচটি ফিফা উইন্ডোতে ৪৯ জন খেলোয়াড়কে ডাকেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনি এখনও সঠিক দল খুঁজে পাননি।”
রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের নতুন উদ্যোগঃ প্রতিভাবান ফুটবলারদের খেলার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ তৈরি করার চেষ্টা

সুদীপ পাকড়াশীঃ মৃত্যুঞ্জয় টুডু। মাঝমাঠ থেকে ডান পায়ের আউটস্টেপে ফ্রি-কিকে শেষ মুহূর্তে বলকে বাঁক খাইয়ে গোলে ঢোকাতে পারে! পার্শাল টুডু। বাঁ পায়ে অসম্ভব স্কিল। নিখুঁত পাস বাড়ানোর দক্ষতা। সম্প্রতি এমপি কাপে তার খেলা দেখে উপস্থিত বাংলার প্রাক্তন কয়েকজন ফুটবলারের কৃশানু দে’র কথাও মনে পড়ে যাচ্ছিল! আরও আছে। সুমন হেমব্রম। যখন তখন উইং থেকে ভেতরে কাট করে ঢুকে গিয়ে গোল করতে পারে! মনে পড়িয়ে দেয় সেরা ফর্মের মানস ভট্টাচার্যের কথা! কিন্তু এরা কারা? রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র। রামকৃষ্ণ মিশন বলতেই আমাদের মনে একটা অন্যরকমের ছবি। লেখাপড়ায় প্রথম, দ্বিতীয় হওয়া মার্কশিট নিয়ে স্কুল থেকে বেরনো কোনও ছাত্র। মৃত্যুঞ্জয় টুডু, পার্শাল টুডুরাও রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম, দ্বিতীয় হওয়া ছাত্র! কিন্তু ফুটবলে। আর এই ছাত্রদের ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের নতুন উদ্যোগ, ফুটবলের মাধ্যমে বিশেষ এই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেওয়া। এই ভাবনার উৎস মিশনের বাইরে বেরিয়ে এবছর প্রথমবার রাজ্যের বাইরের স্কুলগুলোর সঙ্গে খেলা প্রতিযোগিতা। প্রথমে স্বামী বিবেকানন্দ কাপ, তারপর এমপি কাপ। দুটো টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুরলীধরানন্দ মহারাজ প্যারালাল স্পোর্টকে এই প্রসঙ্গে বললেন, “স্কুলের তিনটি বিভাগ আছে। অনাথ, ডেস্টিটিউট আর আদিবাসী। এই তিনটি ক্যাটেগরি থেকে তৈরি হয়েছে দল। এমপি কাপে ছেলেদের পারফরম্যান্স দেখে বুঝলাম ছেলেরা কতটা প্রতিভাবান। তারপরই মনে হল যে, সব ছেলে তো লেখাপড়ায় খুব ভাল রেজাল্ট করে না। কিন্তু এই ছেলেরা খেলাধুলোয় এত প্রতিভাবান যে, ফুটবলের মাধ্যমে এদের ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে।” ইতিমধ্যে, পার্শাল, সুমন, মৃত্যুঞ্জয়দের এম পি কাপে খেলা দেখে, একধিক অ্যাকাডেমির স্কাউটরা আগ্রহী হয়েছেন ওদের নেওয়ার জন্য। কিন্তু মাধ্যমিকের আগে স্কুল থেকে ওরা বেরতে পারবে না। ওদের কোচ ময়দানের তিন প্রধানে খেলা প্রাক্তন কবীর বোস। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনেরই ছাত্র। ২০১৭ থেকে ওদের প্রতিভায় শান দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন। ময়দান একসময় নিয়মিত ফ্রি-কিক থেকে কবীর বোসের বাঁক খাওয়ানো শটে নিখুঁত গোল। আজ মিশনেও কবীরের নিরলস প্রচেষ্টায় মৃত্যুঞ্জয় টুডু শিখেছে ফ্রি-কিক থেকে বাঁক খাওয়ানো শটে গোল করতে। কবীর বলছেন, “এরা খুব সম্ভাবনাময়। কিন্তু ভীষণ গরিব। তাই বাড়ি গেলে আর আস্তে চায় না। খো৬জ নিলে দেখা যাবে বাড়িতে যে অভিভাবক থাকেন, তার সঙ্গেই কাজে নেমে পড়ে ভাত ডাল জোগাড়ে। বন্ধ হয়ে যায় প্র্যাক্টিস।” এবার, সেই পার্শাল, মৃত্যঞ্জয়রাই, কয়েকজন তাদের কবীর স্যারকে বলেছে, ওরা মাধ্যমিকের পরও এভাবেই ফুটবলটা খেলতে চায়, প্রতিষ্ঠা পেতে চায় ফুটবল খেলে। এতেই উৎসাহিত হয়ে কবীর তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “বিভিন্ন অ্যাকাডেমি, এমনকী কোনও ক্লাবেরও ইউথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে এদের ভর্তি করে দেওয়া যায়। আর সেই কাজে আমার উদ্যোগও কম থাকবে না।” আপাতত, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন ব্যস্ত রাজ্য স্কুল অনূর্ধ্ব-১৪ সুপ্রিম কাপের দল তৈরিতে। অগস্টে হবে এই টুর্নামেন্ট। কবীরের আশা, এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে থেকেও ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে পার্শাল টুডু, সুমন হেমব্রমদের।