কদিন আগে এক ক্রিকেট ওয়েবসাইটে নিজের কলমে বিরাট কোহলিকে নিয়ে অনেক কথাই লিখলেন গ্রেগ চ্যাপেল। পুরো লেখায় বিরাট নিয়ে প্রশংসা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না। বিরাট কেমন, কীভাবে নিজের ইনিংস গড়েন। কীভাবে নিজেকে এভারস্টের চূ়ড়ায় তুলে আনলেন, এ সবই লেখায় পাওয়া গেল। কিন্তু বিরাট কেন অবসর নিলেন! তিনি কি অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন! না, এসব কিছু পাওয়া গেল না। এক্ষেত্রে নিজেকে আড়ালে রাখলেন গুরু গ্রেগ। তবে কি এর পিছনেও কোনও কারন আছে!
হতে পারে। ভারতীয় দলের হেড কোচ বা নির্বাচকদের নিয়ে কথা বলতে গেলে ২০ বছর আগের কথায় যে তাঁকে ফিরতে হবে। সেদিন তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের হেড কোচ। তিন বছরের আখ্যানে তিনি কি করেছেন তা সকলের জানা। সেই পথ ধরে যে বর্তমান কোচ গৌতম গম্ভীর হাঁটা শুরু করেছেন তা নিশ্চয় বুঝতে অসুবিধা হয়নি গ্রেগের। গম্ভীরের মধ্যে হয়তো নিজেকে দেখতে পেয়েছেন গ্রেগ। না হলে কেন এসব আড়াল করবেন। পুরো লেখায় একবারও বিরাটের অবসরের কারন বিশ্লেষনে গেলেন না। কেন! এর ব্যাখ্যা নিশ্চয় এখন আর দেওয়ার দরকার নেই।
কেন বলা হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটে গম্ভীর রাজ শুরু হয়ে গিয়েছে! একথা বলা যাবে না রোহিত ও বিরাট ফর্মে থাকা সত্বেও অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন। গত ১৩ মাসে ব্যাটে রান নেই। ঘরের মাঠে বা বিদেশে তাঁরা রান খুঁজে বেরিয়েছেন। কিন্তু ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। আর এই সুযোগ কাজে লাগালেন গম্ভীর। তিনি চাইছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটে তিনিই প্রথম ও শেষ কথা বলবেন। কিন্তু রোহিত ও বিরাট দলে থাকলে সেটা সম্ভব নয়। তাই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের জমিকে শক্ত করতে হবে। নির্বাচক প্রধান অজিত আগারকরকে সঙ্গে নিয়ে সেই কাজ করে ফেললেন। গম্বীর জানতেন, অধিনায়কের চেয়ার থেকে রোহিতকে সরিয়ে দিলে তিনি দলে থাকবেন না। অবসর নিতে বাধ্য হবেন। সেটাই হল। রোহিত সরে যাওয়ার পর টার্গেট বিরাট। তাঁকে কীভাবে সরাবেন। একই চালে মাত করার চেষ্টা। টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার আগে বিরাট কথা বলেছেন রোহিত ও শাস্ত্রীর সঙ্গে। তার আগে দলের অন্দরমহলের ছবি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এভাবে দলে থাকতে হলে মাথা নিচু করে সব কিছু মেনে নিতে হবে। যা বিরাটের মতো ক্রিকেটারের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ঠিক করেছিলেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেবেন। পরে জাতীয় দলের প্রাক্তন কোচ স্বীকার করেছেন, বিরাটের সিদ্ধান্ত সঠিক। এটাই সঠিক সময়। কিন্তু মন থেকে কি শাস্ত্রী মেনে নিতে পেরেছিলেন! পারেননি। তাঁর এখনও বিশ্বাস বিরাট অনায়াসে আরও দুতিনবছর টেস্ট ক্রিকেটে নিজেক ব্যস্ত রাখতে পারতেন। আবার বিরাটের মনের কথা পড়ে এটাই বিশ্বাস হয়েছিল, এরপরও দলে থাকলে মান থাকবে না। তাই তিনি বিরাটের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। অবাক লাগল নির্বাচক প্রধানের কাজে। তিনি কী করে অস্ট্রেলিয়ায় শেষ টেস্টের আগে বিরাটের কাছে ভবিষ্যত জানতে চেয়েছিলেন। এটা কি একজন নির্বাচক প্রধানের কাজ। সেখানে পাশে বসেছিলেন কোচ গম্ভীর। তিনি কোনও কথা বলেননি। এর থেকে পরিস্কর হয়ে গিয়েছিল, গম্ভীরের মনের কথা অজিতের মুখ থেকে শুনতে হচ্ছে। তাই হয়তো অস্ট্রেলিয়ায় সতীর্থদের বারবার বলতেন, এবার টেস্ট ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াবেন। আর খেলবেন না।
দলের ব্যর্থতায় কোচের দায় থাকে না। এটা ভারতীয় ক্রিকেটে হয়ে আসছে। না হলে গম্ভীরের কাজ নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠবে না। ঘরের মাঠে ও বিদেশে দলের ব্যর্থতা এসেছে তাঁরই কোচিংয়ে। তাঁকে কি প্রশ্ন করা হয়েছিল, দল কেন এমন খেলছে! হয়নি। তার উপর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর রোহিত ও বিরাটদের নিয়ে তিনি উল্লাস করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে বলছেন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রপি না জিতলে গম্ভীরকে নিয়ে প্রশ্ন উঠত। সাফল্য পেলে কোচের কৃতিত্ব, আর ব্যর্থতার দায় ক্রিকেটারদের! কেন এমন বিচার কেন হবে। একথা একবারও বলা হচ্ছে না যে রোহিত ও বিরাট দারুন খেলে দলে জায়গা ধরে রেখেছিলেন। তাঁদের ব্যাটে রান ছিল না। সেই দায় কার। তিনি কি রোহিত ও বিরাটকে নিয়ে আলাদা করে বসেছিলেন। এমন কথা কিন্তু শোনা যায়নি।
আরও শোনা যায়নি বিরাটের অবসরের সিদ্ধান্ত শোনার পর তাঁর কাজের নমুনা। তাঁকে কখনও বলতে শোনা যায়নি যে কেন বিরাট সরে দাঁড়াবে। আমি নিজে ওর সঙ্গে কথা বলব। ওকে বোঝাব, ইংল্যান্ড সিরিজ খেল। তারপর যা করার করবে। এ পথে গম্ভীর হাঁটেন নি। উল্টে অবসরের কথা জানার পর তিনি এক্স হ্যান্ডেলে লিখলেন-উই মিস ইউ। ভাবা যায়!
গ্রেগ দায়িত্ব পাওয়ার পর ভিশন ২০০৭ করে এগোতে চেয়েছিলেন। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে বিশ্বকাপ ছিল। তাই দলের দায়িত্ব পেয়েই সিনিয়র ক্রিকেটরদের ক্রিকেটারদের ছেঁটে ফেলার চেষ্টা করলেন। বিশ্বকাপে ভারত প্রথম রাউন্ডে ছিটকে গেল। তারপর তিনি দলে নিয়ে এলেন জে পি যাদব, বেনুগোপাল রাওদের। ওঁরা কতদিন ক্রিকেট খেলেছেন। ইরফান পাঠানকে অলরাউন্ডার বানাতে গিয়ে বোলিং ভুলিয়ে দিলেন। তারপর নিজের ভুল বুঝতে পেরে চাকরি হারালেন। গম্ভীরও চান সিনিয়রদের সরিয়ে নিজেই বিগ বস হয়ে বসবেন। টি২০ ক্রিকেটে সফল হওয়া ক্রিকেটারদের নিয়ে টেস্টে ভাল কিছু করার ভাবনা। সফল হতে পারবেন তো!
গম্ভীরের কাজ কিন্তু গ্রেগের মতো কঠিন নয়। তাঁর লবি ভাল। তিনি কিভাবে কোচ হলেন সেকথা এখন বলে লাভ নেই। সফল হলে বলবেন, আমার ভাবনা ঠিক ছিল। এভাবে এগিয়ে একটি নতুন দল তৈরি করতে চেয়েছি। আর হারলে বলবেন একট নতুন দল তৈরি করতে গেলে সময় দিতে হবে। তাড়াহুড়ো করলে চলবে না। এই ভাবে আড়াই বছর কেটে গেল ক্ষতি কি! চাকরির মেয়াদ তো আর আড়াই বছর। তাই না!
প্রথম কাজে সফল হয়ে তিনি নেমে পড়লেন অধিনায়ক নির্বাচনে। গিলকে অধিনায়ক করতে হবে। গোঁ ধরে বসলেন। এক শীর্ষস্থানীয় কর্তা অন্য নাম নিয়ে এলেও গম্ভীরর কাছে টিকতে পারলেন না। গিল কমবয়সী ছেলে। গম্ভীর যা বলবেন, তাই শুনবেন। তিনি তো এটাই চাইছিলেন। সেটাই হতে চলেছে। প্রথম হার্ডল সাফল্যের সঙ্গে পার করতে পারলে আর তাঁকে কে পায়। সেভাবেই চলে দলে নিজের রাজ প্রতিষ্টিত করতে চাইবেন। সেটা হয়তো শুরুও হয়ে গিয়েছে। গ্রেগের ভিশন ২০০৭ ছিল। গম্ভীরের ২০২৭। দেখা যাক, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় কিনা।







