অস্ট্রেলিয়াঃ ২১২, ২০৭
দক্ষিন আফ্রিকাঃ ১৩৮, ৫ উইকেটে ২৮২
ছবিটা পরিস্কার ছিল না। তবে শুক্রবার খেলা যখন শেষ হয়, তখন একটা জিনিস পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল বিরাট অঘটন কোনও না ঘটলে দক্ষিন আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল জিতছে।
শনিবার অঘটন ঘটেনি। প্রথম সেশনে অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া টার্গেট ২৮২ রান পার করতে অসুবিধাও হল না। পাঁচ উইকেটে জিতে ক্রিকেট ইতিহাসে দেশের নাম তুললেন অধিনায়ক বাভুমা। রাবাডা, মার্করামদের পারফরম্যান্সকে ছোট না করেও বলতে হচ্ছে, শেষ বাজি জিতে লর্ডসের লর্ড হয়ে গেলেন বাভুমা। তিনি বিরাট কিছু করেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে চাপের মুখে ব্যাট করতে নেমে করেছেন ৬৬ রান। তৃতীয় উইকেট জুটিতে মার্করামের সঙ্গে যোগ করেছেন ১৪৭ রান। এখানেই ফাইনাল থেকে হারিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। তারপর তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে এটাও ঘটনা যে
রাবাডার ৯ উইকেট। মার্করামের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি না এলে দক্ষিন আফ্রিকার কাছে সাফল্য সহজে ধরা দিত না। তবু দলের অধিনায়ককে সবাই যে আলাদা করে বেছে নেন। নির্বাসন থেকে ফিরে, বলা যায় দ্বিতীয় ইনিংসে ( ৩২ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে) ভাল খেলেও আইসিসি ট্রফি দক্ষিন আফ্রিকা দেশের বোর্ড অফিসে নিয়ে যেতে পারেনি। বরং চোকার্স কথাটি তাঁদের পিঠে চেপে বসেছিল। সেই জায়গা থেকে দেশকে বের করে আনলেন বাভুমা অ্যান্ড কোং। এর থেকে বড় কৃতিত্ব আর কি হতে পারে। জয়ের রান আসার পর দেশের প্রাক্তন ক্রিকেটাররা মাঠে নেমে পড়লেন। কে নেই সেখানে! প্রাক্তন অধিনায়ক গ্রেম স্মিথ, শন পোলক, এ বি ডিভিলিয়ার্স সহ অনেকেই। তাঁরাও আজকের দেশের বীরদের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেন। এমন মুহূর্তের সাক্ষী নিজেদের ক্রিকেট জীবনে হতে পারেননি। এবার বাভুমারা পেরেছেন। তাই প্রাক্তন ও বর্তমান মিশে যেতে দেরি হল না।
একটা সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যান ছিল দক্ষিন আফ্রিকা। সেটা নব্বই দশকের শুরুতেও ছিল। আইসিসি নির্বাসিত করার পর বিশ্বের কাছে নিজেদের প্রমান করার জায়গা ছিল না। সব থেকে হতাশায় ভুগছিলেন সেই সময়কার ক্রিকেটাররা। ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মূল স্রোতে ফিরে আসার পর কলকাতায় এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছিলেন। দেশের প্রবাদপ্রতিম মানুষ নেলসন ম্যান্ডেলাও এসেছিলেন ইডেনের মাটিতে। সেই জায়গা থেকে পথ চলা শুরু অ্যালান ডোনাল্ডদের। সেবারই হিরো কাপে ইডেনের বুকে দক্ষিন আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। হারলেও বিশ্ব ক্রিকেটের কড়া নাড়িয়ে দিয়েছিল দক্ষিন আফ্রিকা। জানিয়ে দিয়েছিল আমরা এসে গিয়েছি। এই স্লোগান বিশ্ব ক্রিকেটে ছড়িয়ে পড়েছিল।
সব হল। কিন্তু আইসিসি টুর্নামেন্টে দক্ষিন আফ্রিকাকে কখনও নায়ক হতে দেখা যায়নি। তীরে এসে তরি ডুবে যাওয়ার মতো ঘটনা বারবার ঘটেছে। সেটা শুরু থেকেই। নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পর প্রথম বছরেই (১৯৯২ ) বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেও বৃষ্টির জন্য হারিয়ে যায়। আইসিসি টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপে) কখনও সেমিফাইনাল, কখনও কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে তারা বিদায় নিয়েছে। কদিন আগে টি২০ বিশ্বকাপেও দরজার কড়া নেড়ে ছিটকে গিয়েছে। ভারতের কাছে ফাইনালে হেরে দেশে ফেরে দক্ষিন আফ্রিকা।
অবশেষে দিন এল। সাফল্যও ধরা দিল। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের প্রথম দুদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি দক্ষিন আফ্রিকাকে। কিন্তু তারপর! তৃতীয় দিনের লাঞ্চের পর থেকে খেলা ঘুরতে শুরু করল। বিশেষ করে মার্করাম ও বাভুনা জুটি যা করলেন, তারপর অস্ট্রেলিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনটা হতে পারে তা কামিনসরাও বুঝতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়া শিবির তাই বলছে, ওদের তৃতীয় উইকেট জুটি আমাদের হারিয়ে দিল। না হলে আমরা ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরতাম। যা হয়নি, এখন তা নিয়ে কথা বলে লাভ কি!
উল্টোদিকে দক্ষিন আফ্রিকা শিবিরে আনন্দে ক্রিকেটারদের চোখ ভিজে যেতে দেখা গেল। কেশব মহারাজ থেকে শুরু করে মার্করামরা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তার টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতেছেন। টেস্ট শুরুর আগেও প্রায় সবাই অস্ট্রেলিয়াকে ফেভারিট হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। তারপ প্রথম দুদিন বড় ধাক্কা। রাবাডা প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়ে দলকে সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে দিয়েও ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় লাভ হয়নি। দ্বিতীয় ইনিংসে রাবাডা আবার চার উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে ফেলে। তবু টার্গেট কম ছিলনা। চতুর্থ ইনিংসে ২৮২ রান করে টেস্ট জয় সহজ ছিলনা। প্রথম ইনিংসে ৭৪ রানে পিছিয়ে থাকা দল এভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তা কে আগে ভেবেছিলেন। কিন্তু টেস্ট ম্যাচের সেরা মার্করাম ও বাভুমা জুটি জটিল অঙ্ককে সহজে সমাধান করে দিলেন। শনিবার দিনের শুরুতে বাভুমাআউট হয়ে গেলেও মার্করাম যেন দলকে ম্যাচ না জিতিয়ে ফিরতে চাননি। তাই অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। ন্যাথান লিঁয় কোনও উইকেট পেলেন না। পেসারদের দাপটও দেখা গেল না। একটা বড় পার্টনারশিপ অস্ট্রেলিয়াকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়ে আনল। পাঁচ উইকেটে জিতে দক্ষিন আফ্রিকা প্রমান করল এরপর তাদের নিয়ে কেউ অন্তত চোকার্স কথাটি বলবেন না।







