একদিকে ছিল প্রতিশোধ নেওয়া। অন্যদিকে ছিল গর্বের মুহূর্তের সাক্ষী থাকা। দুটো স্বপ্নপূরণ হয়েছে। সেই কারণে ৫ জুলাই ২০২৫ দিনটাকে স্বর্ণাক্ষরে হৃদয়ে লিখে রেখে দিয়েছেন সঙ্গীতা বাসফোর। কল্যাণীতে বসে একটানা কথাগুলো বলে গেলেন তিনি। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে তঁার জোড়া গোল-ই ভারতীয় মহিলা দলকে এএফসি এশিয়ান কাপে খেলার সুযোগ করে দিয়েছে।
সোমবার সঙ্গীতা যখন কল্যাণীর বাড়িতে ফেরেন তখন ভোরের আকাশ সবে ফঁাকা হতে শুরু করেছে। বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই তঁাকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। সাংবাদিকরা ছুটে আসবেন, স্বাভাবিক কথা। কিন্তু কল্যাণীর ফুটবল প্রেমীরাও এসে তঁার সঙ্গে দেখা করেছেন। কেউ কেউ ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। হবে না কেন? মূলত তঁার জন্যই ভারত পেরেছে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার ভিসা জোগাড় করতে। আগামী বছর এএফসি এশিয়ান কাপের খেলা হবে অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে প্রায় তিন যুগ পরে যোগ দেবে ভারত।
“আমরা প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে থেকে ঠিক করে ফেলেছিলাম, বহুদিন বাদে আমরা যেন হাসি মুখে বাড়ি ফিরতে পারি। তারজন্য প্রত্যেককে ১০০ শতাংশ দিতে হবে। সেইমতো যারা খেলতে নেমেছে তারাই লড়াই করার মানসিকতা দেখিয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি ম্যাচের আগের দিন কোচ আমাদের নিয়ে টিম মিটিং করতেন। সেখানেও আমরা হাসি মুখে বাড়ি ফেরার কথাগুলো বারবার বলতাম।”কল্যাণীর বাড়িতে বসে একটানা কথাগুলো বলে গেলেন সঙ্গীতা। থাইল্যান্ডের সঙ্গে ভারতের ম্যাচ ছিল ৫ জুলাই। সেই ম্যাচই ছিল দুটি দলের কাছে এএফসি এশিয়ান কাপে খেলার ছাড়পত্র পাওয়ার সুযোগ। শুধু প্রয়োজন ছিল জয়। খেলা ছিল থাইল্যান্ডে। স্বভাবতই বাড়তি একটা চাপ ভারতীয় মহিলাদের উপর ছিল। সেইসব চাপ কাটিয়ে কীভাবে জিতলেন? জবাব দিতে গিয়ে সঙ্গীতা বলছিলেন, “থাইল্যান্ডের সঙ্গে আমরা আগেও খেলেছি। এশিয়ান গেমসের সেই ম্যাচে আমরা ১-০ গোলে হেরে যাই। তাই আমাদের কাছে ম্যাচটা ছিল প্রতিশোধের। যেভাবে হোক থাইল্যান্ডকে হারাতে হবে এমন শপথ নিয়ে আমরা মাঠে খেলতে নামি। তাছাড়া এই ম্যাচের উপর আমাদের এশিয়ান কাপে খেলার ছাড়পত্র পাওয়ার ব্যাপার ছিল। সেই কারণে সকলে মরণ পণ করে ঝঁাপাই। তাছাড়া ম্যাচের আগে আমরা নিজেরা বসে ঠিক করি, ৯০ মিনিট খেলার পরে যাইহোক না কেন, আক্ষেপ করব না। যা হবে মাঠে নেমে করতে হবে। তাছাড়া হাসি মুখে বাড়ি ফেরার ব্যাপারটাও মনের কোণে উঁকি মেরে গিয়েছে। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডকে হারানো ছাড়া আমাদের অন্যকোনও ভাবনা মাথায় আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে যদি থাইল্যান্ডের বদলে অন্যকোনও দল হত তাহলেও একই কথা মাথায় রেখে চলতাম।” বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলে গেলেন সঙ্গীতা।
দুটো গোলের মধ্যে প্রথম গোলটাকেই এগিয়ে রাখলেন তিনি। কেন রাখলেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বাবা শেখর বাসফোরের মেয়ে বলছিলেন, “দুটো গোলই ভাল হয়েছে। তবে প্রথম গোলটাকে এগিয়ে রাখছি এই কারণে, ওই গোলটার পর পুরো দল উদ্বুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রত্যেকে জেতার নেশায় বঁুদ হয়ে যায়।” বিরতির পর খেলা শুরু হওয়ার মিনিট দুয়েকের মধ্যে গোলশোধ করে দেয় থাইল্যান্ড। সঙ্গীতার কথায় তারপর দল কিছুটা ছন্নছাড়া ফুটবল খেলতে শুরু করে। একটা উদ্বিগ্নতা কাজ করতে থাকে। মিনিট ১৫ সেইভাবে কাটার পর পুরো দল আবার চেগে ওঠে। সকলে তখন একটা কথাই বলে, এখানে সকলে এসেছে কেন, কেন ভাল মতো শুরু করেও পিছিয়ে পড়ব? তারপর থেকে পুরো দল আবার খেলায় ফিরে আসে। সেই মুহূর্তে সঙ্গীতা হেডে জয়সূচক গোল করেন। যখন গোল করেন তখন মিনিট ১৫ খেলা বাকি ছিল। তখন দলের প্রত্যেকে ঠিক করে ফেলে যদি মরে যায় তাহলেও গোল খাওয়া চলবে না। সেইমতো খেলে ম্যাচটা জিতে মাঠ ছাড়ে দল।
“অতীতে বহু ম্যাচ আমার স্মরণীয় হয়ে আছে। কিন্তু এই দিনটাকে কোনওদিন ভুলতে পারব না। ৫ জুলাই ২০২৫ সাল আমার হৃদয়ে গঁাথা হয়ে থাকবে। এএফসি এশিয়ান কাপে ফের আমরা খেলতে যাব। এই স্বপ্ন নিয়েই তো আমাদের ফুটবলার হওয়া। তাই আমার জীবনে এই দিনটাই স্মরণীয় হয়ে থেকে যাবে।” বললেন সঙ্গীতা। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে জোড়া গোল কাকে উত্্স্বর্গ করবেন জানতে চাইলে সঙ্গীতা বলে ফেললেন, “আমার জোড়া গোল অবশ্যই পরিবারকে উত্্স্বর্গ করতে চাই। কিন্তু যারা আমাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন, যাঁরা আমাকে ফুটবলার করতে সাহায্য করেছেন, তঁাদের প্রত্যেককে এই গোল উত্্স্বর্গ করছি। কারণ তঁাদের অবদান কোনওদিন ভুলতে পারব না।”







