ভবিষ্যতের পরিকল্পনা মাফিক নয়। বাবা-মার ইচ্ছাপূরণও নয়। স্রেফ খেলার ছলে খেলতে এসে এখন ভারতীয় ব্যডমিন্টনের প্রচারের আলোয় চলে এসেছেন অর্যমা চক্রবর্তী। সম্প্রতি গোয়ায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগের ভারতীয় রেঙ্কিং টুর্নামেন্ট। সেখানেই অল্পের জন্য হয়তো ব্যর্থ হয়েছে সঁাতরাগাছির মেয়ে। নিশ্চিত থাকুন বাঙালি হিসেবে একদিন আর্যমাকে নিয়ে বঙ্গ ব্যাডমিন্টন প্রেমীরা স্বপ্ন দেখতে বাধ্য হবেন। কারণ, গোপীচাঁদ অ্যাকাডেমিতে এসে এখন পারফরম্যান্সের লেখচিত্র উঠছে। বুঝতে পারছেন তিনি ঠিক কোথায় দঁাড়িয়ে।

গোপীচঁাদ অ্যাকাডেমিতে প্র্যাকটিশে মত্ত অর্যমা।
সঁাতরাগাছি ক্লাবে অর্যমার প্রথম খাতেখড়ি। তারপর ধীরে ধীরে হাওড়া-কলকাতার নানান জায়গায় খেলে এখনকার ঠিকানা গোপীচঁাদ অ্যাকাডেমি। বাবা অশীনব্রত চক্রবর্তী ও মা পৌলমী নাগ। একমাত্র সন্তান। বাঙালির ঘরে আর পঁাচজন মেয়ে জন্মালে যা লক্ষ্য থাকে তাই ছিল অশীন-পৌলমীর ইচ্ছে। মেয়ে পড়াশুনো করে ক্যারিয়ার তৈরি করুক। খেলাধূলোর স্বপ্ন তঁারা কোনও দেখেননি। দেখবেন কি করে? পরিবারের কেউ তেমন খেলাধূলোর মধ্যে ছিলেন না। চারাগাছ জন্মালে তাকে লালন-পালন করাই মালির লক্ষ্য থাকে। বাবা অসীন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। তিন মাসে জলে, তারপরের তিন মাস ডাঙায়। তাই মা পৌলমী কড়া নজরে বড় হতে লাগলেন অর্যমা। দুষ্টুমি করলেও খেলাধূলো নিয়ে বাচ্চাকাল থেকে মেতে থাকতেন। তাই একদিন দুজনে মিলে ঠিক করলেন, সময় কাটাতে মেয়েকে খেলায় দেবেন। সঁাতরাগাছি বাড়ির কাছাকাছি একটা ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানেই ভর্তি করালে সুবিধা হবে, নাম লেখানো হল। দেখা গেল ব্যাডমিন্টন কোর্টেই ঝড় তুলে দিয়েছেন ১৩ বছরের মেয়ে। “ব্যাডমিন্টন বলে নয়, বাড়ির কাছাকাছি ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে বলেই ভর্তি করেছিলাম অর্যমাকে। হয়তো কাছে অন্যকোনও খেলার ব্যবস্থা থাকলে সেখানেই দিতাম।” ফোনে জানিয়ে দিলেন পৌলমী। প্রতিভাকে ঠিকমতো পরিচর্যা করলে তার বিচ্ছুরণ ঘটবেই। হলও ঠিক তাই। ধীরে ধীরে অর্যমা হয়ে উঠলেন শার্টলার প্রিয়। নামও ততদিনে করে ফেলেছেন। অনূর্ধ-১৩ বিভাগে ভারতীয় রেঙ্কিংয়ের খেলা কলকাতার স্টার অ্যাকাডেমিতে হয়েছিল। প্রথম নেমেই বাজিমাত। উঠে গেলেন সেমিফাইনালে। তখনই বাবা-মা ঠিক করে ফেলেন, একমাত্র মেয়ের ইচ্ছেকেই তঁারা গুরুত্ব দেবেন। তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাননি।
“আমরা চাই, মেয়ে যা চাইছে তাই হোক। বাচ্চাকালে আমাদের ইচ্ছেপূরণ হয়নি। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সেইদিকে ঠেলে দেয়নি। তাই আমরা দুজনে ঠিক করলাম অর্যমা যা হতে চায় তাই হোক। আমরা তাকে সার্পোট করে যাব। যদি খেলাকে ঘিরে ক্যারিয়ার তৈরি করতে চায় তাই করুক। সকলেই তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য ছুটছে। আমার মেয়ে নাহয় খেলাধূলোকে ভালোবেসে এগোক।” অকপট স্বীকারোক্তি পৌলমীর। আরও বেশি তঁাদের ঠেলে দিয়েছে গোপীচঁাদ অ্যাকাডেমি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হায়দরাবাদে পাকাপাকি ভাবে চলে এসেছে চক্রবর্তী পরিবার। বাবা যখন জল ছেড়ে ডাঙায় পা রাখেন তখন চলে আসেন হায়দরাবাদে। প্রয়াত হয়েছেন নিজের বাবা-মা। পরিবারের বাকি সদস্যরা সকলে থাকেন সঁাতরাগাছিতে। ব্রত নিয়েছেন অসীনব্রত, মেয়েকে ব্যাডমিন্টনের আঙীনায় মেলে ধরবেন। ঘরকুনো হওয়ার ইচ্ছে, নিকট আত্মীয়-বন্ধু-বান্ধবকে জলাঞ্জলি দিতে কুন্ঠাবোধ করছেন না। এমন কী কলকাতার একটা বড় স্কুলে ক্লাস নাইনে ওঠা মেয়েকে নিয়ে ভর্তি করেছেন ওপেন স্কুলে। যেখানে পড়াশোনা চলবে পাশাপাশি স্কুলে যাওয়ার কোনও চাপ থাকবে না।

বাবা অসীনব্রত ও মা পৌলমীর সঙ্গে অর্যমা। হায়দরাবাদের ভাড়া বাড়িতে।
সচরাচর বাচ্চা মেয়ে খাওয়ার জন্য ফাস্ট ফুডের বায়না ধরে। প্রচন্ড খাদ্যরসিক ছিল। মিষ্টি থেকে নোনতা সব খেতে চাইতো। এখন যেন খাবারে সন্যাস নিয়েছেন অর্যমা। স্বাদ, গন্ধহীন খাবার এখন তঁার খাদ্যমেনুতে বরাদ্দ থাকে। কৃচ্ছসাধণের চূড়ান্ত উদাহরণ। সব না হয় মানা গেল, আসল জায়গায় তিনি ঠিক কোথায় রয়েছেন? তার জবাব দিতে গিয়ে হায়দরাবাদ থেকে বাবা অসীনব্রতের ফোন থেকে বলতে লাগলেন অর্যমা, “অল ইন্ডিয়া রেঙ্কিং টুর্নামেন্টে আমি প্রথম ফাইনালে উঠলাম গোয়ায়। তার আগে বেশ কয়েকবার সেমিফাইনালে উঠেছি। গতবার অনূর্ধ্ব-১৩ বিভাগের ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। কোনওদিন সিঙ্গলসে হতে পারিনি।” আগে যাদের কাছে হেরে যেতেন, গোয়াতে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। তাদেরকেই হারিয়ে অর্যমা ফাইনালে ওঠে। মনে আত্মবিশ্বাস যেন টগবগ করে ফুটছে। এবার অর্যমার গলাতে শোনা গেল তারই প্রতিধ্বনি। “বিশ্বাস করুন, হায়দরাবাদ শহরটাকে এখন ভালবেসে ফেলেছি। কলকাতায় থাকতে আমার বিশেষ ভালোলাগেনা। কলকাতায় গেলে প্র্যাকটিশের তেমন সুযোগ-সুবিধা নেই। নেই তেমন বন্ধু-বান্ধব। তাই হাদদরাবাদ এখন আমার কাছে সবচেয়ে ভালোলাগার শহর।” যোগ করলেন আর্যমা, “গোয়ার ফাইনালে আমি সাইনা মনিমুথুর কাছে হেরে গিয়েছি। ওই এখন ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগে এক নম্বরে রয়েছে। সেমিফাইনালে সেখানে হানসিনিকে হারিয়ে ছিলাম তার রেঙ্কিং হল দুই। সুতরাং তাকে তো হারাতে পেরেছি। সেই কারণে আমার এখন একটাই লক্ষ্য ভারতীয় ব্যাডমিন্টনে অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগে শীর্ষস্থান দখল করা। তাছাড়া সিনিয়র স্তরে অলিম্পিকে যাব, পদক জিতব, এসব তো আছেই। যদি বলেন, এই মুহূর্তে আমার লক্ষ্য কি তাহলে বলব, শীর্ষস্থান দখল করা।”
অনুপমা উপাধ্যায়, সাত্ত্বিকসাইরাজ, চিরাগ শেট্টিদের সঙ্গে হায়দরাবাদে থাকলে প্রতিনিয়ত দেখা হয়। তঁারাই জুনিয়রদের উদ্বুদ্ধ করেন। বিশেষ করে অনুপমাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়ে যান অর্যমা। তাই তিনি বলছিলেন, “আমরা যখন ডাবলসে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হলাম তখন ফিরে এসে সাত্ত্বিকসাইরাজদের সঙ্গে ছবি তুলি। তঁারা আমাদের দারুন উত্্সাহ দিয়েছিলেন।” খেলার পরিবেশ যেন ছেঁকে ধরেছে অর্যমাকে। অর্যমা শব্দের বাংলা অর্থ হল সূর্য। বাংলার ব্যাডমিন্টনে সূর্য হয়ে জ্বলজ্বল করুম অর্যমা। এই হোক বাংলার ব্যাডমিন্টন প্রেমীদের ব্রত।







