সুদীপ পাকড়াশীঃ
মৃত্যুঞ্জয় টুডু। মাঝমাঠ থেকে ডান পায়ের আউটস্টেপে ফ্রি-কিকে শেষ মুহূর্তে বলকে বাঁক খাইয়ে গোলে ঢোকাতে পারে! পার্শাল টুডু। বাঁ পায়ে অসম্ভব স্কিল। নিখুঁত পাস বাড়ানোর দক্ষতা। সম্প্রতি এমপি কাপে তার খেলা দেখে উপস্থিত বাংলার প্রাক্তন কয়েকজন ফুটবলারের কৃশানু দে’র কথাও মনে পড়ে যাচ্ছিল! আরও আছে। সুমন হেমব্রম। যখন তখন উইং থেকে ভেতরে কাট করে ঢুকে গিয়ে গোল করতে পারে! মনে পড়িয়ে দেয় সেরা ফর্মের মানস ভট্টাচার্যের কথা!
কিন্তু এরা কারা? রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র। রামকৃষ্ণ মিশন বলতেই আমাদের মনে একটা অন্যরকমের ছবি। লেখাপড়ায় প্রথম, দ্বিতীয় হওয়া মার্কশিট নিয়ে স্কুল থেকে বেরনো কোনও ছাত্র। মৃত্যুঞ্জয় টুডু, পার্শাল টুডুরাও রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম, দ্বিতীয় হওয়া ছাত্র! কিন্তু ফুটবলে। আর এই ছাত্রদের ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের নতুন উদ্যোগ, ফুটবলের মাধ্যমে বিশেষ এই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেওয়া।
এই ভাবনার উৎস মিশনের বাইরে বেরিয়ে এবছর প্রথমবার রাজ্যের বাইরের স্কুলগুলোর সঙ্গে খেলা প্রতিযোগিতা। প্রথমে স্বামী বিবেকানন্দ কাপ, তারপর এমপি কাপ। দুটো টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুরলীধরানন্দ মহারাজ প্যারালাল স্পোর্টকে এই প্রসঙ্গে বললেন, “স্কুলের তিনটি বিভাগ আছে। অনাথ, ডেস্টিটিউট আর আদিবাসী। এই তিনটি ক্যাটেগরি থেকে তৈরি হয়েছে দল। এমপি কাপে ছেলেদের পারফরম্যান্স দেখে বুঝলাম ছেলেরা কতটা প্রতিভাবান। তারপরই মনে হল যে, সব ছেলে তো লেখাপড়ায় খুব ভাল রেজাল্ট করে না। কিন্তু এই ছেলেরা খেলাধুলোয় এত প্রতিভাবান যে, ফুটবলের মাধ্যমে এদের ভবিষ্যৎ তৈরি হতে পারে।”
ইতিমধ্যে, পার্শাল, সুমন, মৃত্যুঞ্জয়দের এম পি কাপে খেলা দেখে, একধিক অ্যাকাডেমির স্কাউটরা আগ্রহী হয়েছেন ওদের নেওয়ার জন্য। কিন্তু মাধ্যমিকের আগে স্কুল থেকে ওরা বেরতে পারবে না।
ওদের কোচ ময়দানের তিন প্রধানে খেলা প্রাক্তন কবীর বোস। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনেরই ছাত্র। ২০১৭ থেকে ওদের প্রতিভায় শান দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন। ময়দান একসময় নিয়মিত ফ্রি-কিক থেকে কবীর বোসের বাঁক খাওয়ানো শটে নিখুঁত গোল। আজ মিশনেও কবীরের নিরলস প্রচেষ্টায় মৃত্যুঞ্জয় টুডু শিখেছে ফ্রি-কিক থেকে বাঁক খাওয়ানো শটে গোল করতে।

কবীর বলছেন, “এরা খুব সম্ভাবনাময়। কিন্তু ভীষণ গরিব। তাই বাড়ি গেলে আর আস্তে চায় না। খো৬জ নিলে দেখা যাবে বাড়িতে যে অভিভাবক থাকেন, তার সঙ্গেই কাজে নেমে পড়ে ভাত ডাল জোগাড়ে। বন্ধ হয়ে যায় প্র্যাক্টিস।”
এবার, সেই পার্শাল, মৃত্যঞ্জয়রাই, কয়েকজন তাদের কবীর স্যারকে বলেছে, ওরা মাধ্যমিকের পরও এভাবেই ফুটবলটা খেলতে চায়, প্রতিষ্ঠা পেতে চায় ফুটবল খেলে। এতেই উৎসাহিত হয়ে কবীর তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “বিভিন্ন অ্যাকাডেমি, এমনকী কোনও ক্লাবেরও ইউথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে এদের ভর্তি করে দেওয়া যায়। আর সেই কাজে আমার উদ্যোগও কম থাকবে না।”
আপাতত, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন ব্যস্ত রাজ্য স্কুল অনূর্ধ্ব-১৪ সুপ্রিম কাপের দল তৈরিতে। অগস্টে হবে এই টুর্নামেন্ট। কবীরের আশা, এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে থেকেও ভবিষ্যতে পাওয়া যেতে পারে পার্শাল টুডু, সুমন হেমব্রমদের।







